বিষয়ঃ বেঙ্গল আর্ট ইনিশিয়েটিভ

প্রিয় পাঠক/ব্লগার,

বেঙ্গল আর্ট ইনিশিয়েটিভ

কেন বেঙ্গল আর্ট ইনিশিয়েটিভ ?

কেন বেঙ্গল আর্ট ইনিশিয়েটিভ ? — এই কথাটা শুধু আমাদের কাছেই নয়, দলের বাইরে যে কোনও মানুষের কাছে পরিস্কার হওয়া দরকার। প্রস্তাবকারী হিসাবে আমার কিছু দায়িত্ব আছে এ ব্যাপারে খোলসা করে বলার।

প্রথম কথা হচ্ছে যে গত ৩১.০৫.২০১৪ তারিখে সদস্য বিলেন্দ্র নাথ মন্ডলের বাড়িতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সভায় দলের নামকরণের জন্য প্রায় ১৭-১৮টি নাম জমা পড়ে, সদস্যরা এক এক করে নাম প্রস্তাব করেন– তাতে প্রত্যেকটি নামের ব্যাপারে খুব জোরালো যুক্তি বা ব্যাখ্যাঃ সেভাবে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গিয়েছে, তা খানিকটা অস্পষ্ট, ভাসা ভাসা এবং বহুল প্রচলিত। আর এটা বোঝা যাচ্ছিল যে, যে জিনিসটা কোনও দলগঠনের ক্ষেত্রে সবার আগে স্থির করতে হয়, সেটা হল তার “লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য”। খুব বড় ভাবে এটাকে না দেখলেও এক কথায় বলা যায় এবং আমাদের প্রত্যেকেরই কাছে যা বাস্তব অভিজ্ঞতার কষ্ঠিপাথরে এটা যাচাই হয়ে যায় তা হল একটা দর্শনগত অভিধার কথা। এমনকি আমরা যদি বলতাম যে আর্ট গ্রুপ হিসাবে একটি নির্দিষ্ট আর্ট ল্যাংগুয়েজে আমরা পৌঁছে গেছি এবং পৌঁছেই গেছি যখন, তখন কোনও দার্শনিক প্রত্যয় ছাড়া কোনও আর্ট ল্যাঙ্গুয়েজের জন্ম হতে পারে না, এটা ধরে নিতে পারি। সেভাবেই আমরা প্রত্যেকে সমবেত ভাবে সংঘবদ্ধ প্রাক্টিসে আছি, তখন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বা প্রত্যয়ের উপর নির্ভর করে একটি নাম বেছে নিতে পারতাম এবং কার্যতঃ তাই হবার কথা।

কিন্তু আমরা প্রায় ন’দশজন সমকালীন শিল্পচর্চাকারী, ছন্নছাড়ার মতন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে প্রাত্যহিক জীবনযাপনের দায়দায়িত্ব সামলে একটু আধটু বা অনেকটা বা যতখানি সম্ভব নিবিষ্টভাবে শিল্পচর্চায় মগ্ন থাকতে ভালবাসি বা হামেশাই থাকি, সমগ্র শিল্পকলার পরিমণ্ডলের অন্তর্গত কূটকচালী, রাজনীতি, পেশাদারীত্বের রেশারেশি, প্রতিযোগীতা– এ সবে বিব্রত বোধ করি, অথবা এ সব সহ্য করতে করতেই আমাদের মনের সুপ্ত কামনা বাসনার দাবীতে যখন নিজেরাই স্ব-উদ্যোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হই– নিজেদের প্রদর্শনী, দলগত বা ব্যক্তিগত ভাবে আয়োজন করি, করার চেষ্টা করি, তখন তার মধ্যে কতকগুলো রূঢ় বাস্তব, ঐতিহাসিক, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি নানারকম কারণ পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। আমরা চাই বা না চাই– সেটা হতেই থাকে। তার অন্যতম কারণ হল– কোনও শিল্পীই নিজেকে প্রকাশ না করে থাকতে পারেন না এবং যেহেতু আর্ট একটা কমিউনিকেটিং ল্যাঙ্গুয়েজ এবং অন্যকে (বা দর্শককে, এমন কি নিজেকেও) কমিউনিকেট করাটা শিল্পীর মস্তবড় একটা দায় হয়ে দাঁড়ায় (এমন কি বিক্রি বাটা পর্যন্ত!) — সেহেতু প্রত্যেক সমকালীন সৃজনশীল শিল্পীকে এই ধরণের আক্টিভিটিজ চালিয়ে যেতেই হয় নয়তো তাঁর হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, শুকিয়ে যেতে পারে তাঁর সৃজনশীল মনটা।

এখন, এই হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই হয়তো তাঁরা সঙ্গবদ্ধ হন, দল বা গ্রুপ তৈরী করেন নিজেদের আইডেন্টিটি বজায় রাখবার জন্য। আমি এতগুলি কথা এখানে বললাম এই কারণে যে, আমাদের সবাই প্রায় এইরকম একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছি। আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ভাবনা ও স্বরের বাহক, নির্মাণ বা চিত্রভাষা সৃজনেও বিভিন্নরকম প্রচেষ্টা, নিজেদের মধ্যে মিল থাকলেও অমিলটাও কম নেই–এক কথায় যে যার, সে তার মতন আর্ট প্রাকটিস চালিয়ে যাচ্ছি এবং সেটা চালিয়ে যাচ্ছি নিজেদের নিজেদের নির্দিষ্ট স্পেস (বা পরিসর)-এ বসে। এর উপর শাঁড়াশীর মতন মাথার উপর চেপে বসে থাকে নতুনত্বের অনুসন্ধান। আত্মপরিচয় একটা বড়সড় ফ্যাক্টর বলে প্রায় অন্যান্য গ্রুপ আর্টস্টদের মতন আমাদেরকেও হন্য হয়ে ঘুরপাক খেতে হয়। সুতরাং আমরা যখন জড়ো হই, সমবেত ভাবে কোনও কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা করি, তখন মোটামুটি প্ল্যাটফর্ম গোছের একটা কিছু গড়ে ওঠে যার মধ্য দিয়ে আমরা প্রকাশিত হই। এই প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে আমাদের কাজকর্ম গুলো দর্শকের সামনে হাজির হয়।

দর্শক বলতে প্রধানতঃ আমাদের বন্ধুবান্ধবদেরই বোঝায় যারা একই সঙ্গে শিল্পচর্চাকারী এবং একই সঙ্গে দর্শকও। বাকীরা হলেন বিশিষ্ট কিছু মানুষ, গুণী বয়স্ক শিল্পীরা, পরিবারের সদস্যরা এবং মিডিয়ার সাংবাদিক বা কলাসমালোচক আর কিছু খুচরো মানুষ যারা আমাদের পরিচিত, উৎসুক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে গ্যালারীতে আসেন–আর্ট বুঝুন না বুঝুন, শিল্পকলার প্রদর্শনীতে উপস্থিত হওয়া এবং শিল্পীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা উপভোগ করেন। অনেকসময় এঁদের মধ্যে অনেকে উৎসাহিত হয়ে দু’চারখানা স্বল্প মূল্যের ছবি/মূর্তি যে কিনে ফেলেন না তা নয়, তবে তাঁরা নিয়মিত কালেক্টার নন। এঁরা অল্পসল্প ক্রয় করলেও শিল্পকেন্দ্রীক যে বাজার ব্যবস্থা বা আর্টবাজার বলে যাকে জানি আমরা এবং সেখানে যে মূলধন বিনিয়োগকারীদের প্রবল দাপট তার সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। এঁরা ভালবেসে বা একান্তই শিল্পীদের জীবন যাপনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বা আর্টের বিশেষ মহত্ব হয়ত এঁদেরকে প্ররোচিত করে। এগুলো উল্লেখ করলাম এই কারণে যে আর্টবাজারের যে ধুন্ধুমার কান্ডকারখানা এবং তার সঙ্গে মিডিয়া-কলা সমালোচক-আর্ট প্রমোটারশীপ-আর্টগ্যালারী-আর্টসেন্টারের যে যৌথ চক্রব্যূহ–তার পাল্লায় পড়ে অনেককেই দিশাহারা হতে হয়। অবশ্য প্রায় প্রত্যেক শিল্পীই ঐরকম একটা কিছুর মধ্যে যেতে চান যাতে তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিষয় আশয় পূরণ হয়–এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কথা হল সবার ক্ষেত্রে তো সেটা হয় না। সবাই এঁটেও উঠতে পারেন না প্রতিযোগীতার ইঁদুর দৌড়ে নাম লিখিয়ে। এই সিস্টেম বা ব্যাবস্থাপনার ব্যাপারে আবার একদল থিয়োরিটিশিয়ান আছেন যারা মনে করেন এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে আর্টের জন্ম হয়েছে যার আবার একটা বিরোধীপক্ষ আছেন, তবে তাঁদের নাক উঁচু ভাবটা বড্ড বেশী এবং যখন দেখেন যে শিল্পীরা বাজার লব্ধ অর্থ রোজগারে ভীষণভাবে সফল, সিগ্নেচার আর্টিস্ট হিসাবে বিরাট সুনাম তৈরী হয়েছে তাঁদের প্রতি হঠাৎ মনযোগী হয়ে পড়েন এবং একসময় দেখা যায় তত্ত্বগত ভাবে কোনও কোনও শিল্পীকে মাথায় তুলে নাচানাচি না করে থাকতে পারছেন না; অর্থাৎ ডিস্কোর্স টিস্কোর্স-এর নামগন্ধ নেই, তাঁদের কাছে আর্থিক সাফল্যই আর্ট হওয়া না হওয়ার একমাত্র ‘মাপকাঠি’। গ্যালারী না হয় সেটা ভাবতে পারে, কিন্তু তাঁরা কেন..?..!!

এরকম একটা বিদ্ঘুটে, গোলমেলে পরিস্থিতিতে (যাকে বলে প্যান্ডিমনিয়াম) যারা অত্যন্ত মনযোগী, নতুন কিছু সৃষ্টির সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন তাঁরা কি করবেন ? অথবা সদ্য পাস করা তরুণ থেকে তরুণতর শিল্পী –যাদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার শূণ্য হলেও সাহস, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, ‘সবুজের অভিযান’–এসব সম্বল করেই কিছু করতে চায়, অথবা দীর্ঘদিন ধরে বছরের পর বছর নিবিষ্টভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, জীবনযাপনের সমস্ত দায় এক হাতে সামলে আর এক হাতে নিজেদের মনের খোরাক উৎপাদন করেন– তাঁরা কি করবেন, কোথায় যাবেন ? বিখ্যাত কলা সমালোচকের ভাষায়– “ধনতন্ত্রের সঙ্গে কুস্তি করে শিল্পীকে বেঁচে থাকতে হয়..” এবং প্রয়াত, প্রখ্যাত বরিষ্ঠ শিল্পীর ভাষায় “..উঞ্ছবৃত্তি করে..” — বাজারে/সমাজে/মিডিয়ার জগতে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিতদের পাশাপাশি এইসব তথাকথিত “উদবৃত্তরা” অথবা আটপৌরে আর্ট-জগতের ধুরন্ধর ব্যবসায়ী, লিডার-শিল্পী, আর্ট-প্রোমোটার বা দালালদের মনোগত ইচ্ছার ভাষায় “বাতিল”, “..যারা গ্যালারীতে জায়গা পায় না..!” ইত্যাদি শিরোপায় ভূষিত, পোড় খেতে খেতে যাঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হয়– যতই তাঁরা কন্ট্রিবিউটারী কাজ করুন না কেন, তখন তাঁদের তো আর অন্য কোনও উপায় থাকে না, সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া ছাড়া।

কিন্তু সঙ্ঘবদ্ধ হলেই তো হয় না। কেননা প্রথমেই বলেছিলাম যে আমরা সবাই প্রায় আলাদা আলাদা ভাবে স্বতন্ত্র যেটা খুবই স্বাভাবিক তার মিডিয়া চর্চার কারণে– যে মিডিয়া প্রায় সর্বসময়ই বাক্তিগত, কালেকটিভ ওয়ার্ক্স নয়; সিনেমা, গান, থিয়েটারের মতন নয়! এটা স্বতন্ত্র একটা ভাবনার শরিক, স্বতন্ত্র আঙ্গিক ও স্বর — তার প্রধান বৈশিষ্ট্য আর যেটা ভয়ানকভাবে সক্রীয় থাকে সেটা হল তাঁর স্বাধীনতা বোধ। আমরা জানি কোনও সৃষ্টিই বা নির্মাণ “স্ব-অধীনতা” ছাড়া সম্ভব নয়। আর শিল্পীদের তো অজানা, অনির্দিষ্ট এক অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানো। এটা বলে আমি অন্য মাধ্যমের চর্চাকারীদের মোটেই খাটো করে অসুখী দেখাতে চাই না। প্রত্যেক মাধ্যমের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও ফারাক আছে– সেটা খেয়াল রাখা উচিত। যাইহোক, এ বিষয়ে ঐ গূঢ় তত্ত্বে না ঢুকে আমি বলতে চাই যে শিল্পীদের মধ্যে শিল্প-আঙ্গিক, চিত্রভাষা নিয়ে ভাবনার নানারকম প্রভেদ আছে বলেই হঠাৎ করে কোনও নির্দিষ্ট ভাবনার শরিক হওয়া সম্ভব হয় না — সম্ভব হয় না কোনও “নাম” দলের জন্য গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও। সুতরাং, পারস্পরিক ডিবেট অনিবার্য!

“নাম” এখানে তো একটি নির্দিষ্ট ভাবনাকেই প্রতিফলিত করে। তাই সেই “নাম’ কি হবে সেটা নিয়ে একটা অনিশ্চিত, দোলাচল ভাব দেখা যায়– যেটা আমাদের ক্ষেত্রেও হয়েছে। আমাদের যথেষ্ট সময় লেগেছে “নাম”স্থির করতে। এর জন্য ১৭ থেকে ১৮-টা নাম আমাদের সভায় জমা পড়েছে। এসব থেকেই বোঝা যায় পারস্পরিক ভাবনা/চিন্তার ফারাক আছে বলেই এরকম ঘটেছে। তাই চতুর্থ সভায় সামান্য বিতর্ক সহ অনেকটা সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে নাম বাছাই করতে হয়। সদস্যরা অবশেষে দু’টো নাম বেছে নিলেন যার মাধ্যে ২য় নামটার ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব দেখালেন প্রায় সবাই। নামটা হল Bengal art Initiative, পরে অবশ্য এই নামটার সামান্য সংশোধন করে করা হয়– Bengal-@rt-Initiative

এখন এই নামটার তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যায় যাবার আগে আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের প্রথম মৌখিক সভায় উপস্থিত একজন আমন্ত্রিত সদস্য দলের নামকরণের ব্যাপারে একটা গাইডলাইনের কথা বলেছিলেন, সেটা হল নামটা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যেন লোকাল (অর্থাৎ বেঙ্গল) এবং গ্লোবাল আর আর্ট কথাটা অবশ্যই থাকে। সেদিন বোধহয় সব সদস্যই সহমত পোষণ করেছিলেন বলে আমার মনে হয় এবং আমার যতদূর মনেপড়ে (যেহেতু আমাদের কোনও লিখিত মিনিটস নেই) গাইডলাইন নিয়ে কোনও জোরালো বিতর্ক হয় নি। তা সেই গাইডলাইনটাকে মাথায় রেখে Bengal-@rt-Initiative -কথাটার একটা পুরো ব্যাখ্যাঃ দেওয়া হল এখানে।

১. বেঙ্গল – কোনও দল বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্থানিক বা লোকাল ব্যাপারটার অত্যন্ত গুরুত্ব আছে। আমরা যেহেতু বাংলা বা বাঙালী, ভাষা ও সংস্কৃতির আবহাওয়ায় প্রতিপালিত বা চর্চায় আছি এবং বিশেষ করে অন্য ভাষাভাষি হলেও একই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের আওতায়, বাংলা তার ঠিকানা, সেহেতু বাংলা বা বেঙ্গল কথাটার পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা আছে। আর আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলায় বাংলার যে বিশিষ্ট ভূমিকা তা তো না উল্লেখ করলেও চলে। সকলেই বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছি।

২. @rt – আজকের যুগটা যেহেতু গ্লোবাল কমিউনিকেশানের যুগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির আঙ্গিনায় তাৎপর্য পূর্ণ @ চিহ্নটি কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের অন্তর্গত সাইন এবং আর্টের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ (যেমন-গ্রাফিক ইউজার ইন্টারফেস) সেহেতু স্বয়ংক্রীয়ভাবে (বা অটোম্যাটিক্যালি) গ্লোবাল কথাটার বিস্তৃত তাৎপর্যঃ বহন করছে এখানে। আবার একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত (সার্কেল)-এর মধ্যে স্থিত a-অক্ষরটা at-এর a এবং art-এর a সঙ্গে সমাপতন হচ্ছে যেখানে @–> art-এর দিক নির্দেশ করছে। সুতরাং @ এবং art-এর সমাপতন এখানে গ্রহণীয় এবং দৃশ্যশিল্পের/দৃশ্য-সংস্কৃতির (ভিজ্যুয়াল আর্ট/ভিজ্যুয়াল কালচার) উত্তর-আধুনিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ– এই স্টাইলাইজড প্রয়াস চমকপ্রদ ও অভিনব। এই ধরনের লোগোটাইপ নির্মাণে অপর এক সদস্য নবকুমার চক্রবর্তীর অবদান যদিও পরবর্তীকালে এই লোগোটাইপ তথ্যপ্রযুক্তির জগতে ব্যবহার করতে গেলে কম্পিউটারের চিহ্ন সংক্রান্ত সমস্যার যে উদ্ভব হতে পারে সে কথা ভেবে এই লোগোটাইপ পরিত্যক্ত হয়।

৩. ইনিশিয়েটিভ – এই শব্দটার ক্ষেত্রে আমাদের একটু খটকা লাগছিল যে এই কথাটা গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে কিনা! আমি প্রথমেই অভিধান কি বলছে সেটা এখানে উল্লেখ করি।

Initiative-“Act/do something on one’s own initiative, without an order or suggestion from others.”/ “Capacity to see what needs to be done and the will to do it.”/  ” Have / take the initiative (be in the position to) make the first move.” e.g. in war.—OXFORD

এবার সং সদ অভিধান কি বলছে দেখা যাক-
Initiative (a) – প্রবর্তক; ব্রতী করান হইয়াছে এমন; ভূমিকা স্বরূপ; সূচক; (n) – আরম্ভ; আরম্ভ করার ক্ষমতা বা অধিকার; অন্যের সাহায্য বিনা নিজেই কাজ করার উদ্যম (to take the initiative); On one’s own initiativeনিজ উদ্যম বা চাড়ে।

আমি বোধহয় সবাইকে আশ্বস্ত করতে পেরেছি যে আমরা কোনও ব্যঙ্গবিদ্রুপের সম্মুখীন হব না। অবশ্য সেটা যারা করবেন তারা স্নবারি থেকেই কিংবা জেনে না জেনে করবেন। ইংরাজী ভাষার এটাই মজা, তার যে একটা জাদুকরী মননশীল ব্যাপার আছে তা এমন শব্দের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। খুব সহজ সরল একটা শব্দ কেমন অনেকগুলো অর্থ প্রকাশ করে যার মর্মার্থ খুবই গভীর হয়। আমি আপনাদের আরেকবার উপরের বাক্যগুলো পড়ে দেখতে আনুরোধ করি।

Act/do something on one’s own initiative, without an order or suggestion from others. / Capacity to see what needs to be done and the will to do it. / Have / take the initiative (be in the position to) make the first move.”

“Initiative (a) – প্রবর্তক; ব্রতী করান হইয়াছে এমন; ভূমিকা স্বরূপ; সূচক; (n) – আরম্ভ; আরম্ভ করার ক্ষমতা বা অধিকার; অন্যের সাহায্য  বিনা নিজেই কাজ করার উদ্যম ( to take the initiative); On one’s own initiativeনিজ উদ্যম বা চাড়ে।”

আমার প্রশ্ন, অভিধানের এই কথাগুলো কি খুব গুরুগম্ভীর?! এতো মানুষের খুব স্বাভাবিক প্রবণতা। আর আমরা শিল্পীরা কি তার বাইরে? আমরা তো ঠিকই যে অন্যের সাহায্য ছাড়াই বা নিজ উদ্যমে বা চাড়ে কিছু করতে চাই অথবা করে আসছি। শিল্পনির্মাণটাই তো তাই! যে জায়গাটাতে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুব জোর দিই সেটা হলো — উদ্যম এবং আরম্ভ করার ক্ষমতা বা অধিকারে। আমাদের কি সেই অধিকার নেই নতুন করে কিছু শুরু করার? সেটা কি রাষ্ট কি প্রতিষ্টান বা পাওয়ার গেম-এর মাথায় চড়ে বসে থাকা কিছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের দ্বারা নির্ধারিত? কমবেশী ২০ থেকে ৩০ বছরের পথ পরিক্রমা বা জার্নির মধ্য দিয়ে আমাদের কি সেই ক্ষমতা অর্জন হয় নি? যদি নিজেদের প্রতি সেই আস্থা খুব দৃঢ়ভাবে থাকে তাহলে কে কি ভাবলো বা কে কি বললো তাতে আমাদের কিছু আসে যায় কি? আমাদের সময়কে তো আমাদের মতন করেই বুঝে নিতে হবে। সেই দার্ঢ্যতা (দৃঢ়তা) নিয়ে কাজ করতে পারলে আমরা আমাদের জন্য যে সামগ্রিক পরিকল্পনা করেছি তাকে সঠিকভাবে রূপ দিতে পারলে ঐ “সামাজিক মনস্তত্ব”-র পশ্চাতে যে সজোরে একটি পদাঘাত হবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

এছাড়া যে যুক্তিটা আমাদের সমর্থনে খুবই প্রবল তা হল– শিল্পীদের কাজই তো হল নতুনত্বের সন্ধান করা, যাবতীয় ব্যর্থতার আবর্জনার ভেতরেই তো জন্ম নেয় নতুন একটা সম্ভাবনা, একটা সবুজ কচি পাতা যা আগামীর সূচক হয়ে ওঠে। বলা তো যায় না যে অনেক অনেক শিল্পী দলের গতিময়তা দেখে উজ্জীবিত হচ্ছেন বা যোগ দিচ্ছেন এমন একটা দিন আসতেও তো পারে! আর তাছাড়া সমগ্র শিল্পের ইতিহাস তো আমাদের সেই শিক্ষাই দেয় যে স্রোতের বিরুদ্ধে না গেলে কার্যতঃ কিছু করা যায় না, কন্ট্রিবিউটারি কাজও হয় না।

সুতরাং, Bengal-@rt-Initiative /Bengal Art Initiative— এই কথাটা বা নামটা সার্থকভাবে যে প্রযোজ্য তাতে কোনও সন্দেহ রাখতে পারি কি আমরা? এটাই আমার জানার ইচ্ছা রইল সকলের কাছে।

এই প্রসঙ্গে একটা তথ্য আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সেটা হল কলকাতার শিল্পপতিদের একটা সংগঠন Bengal Initiativeযার অস্তিত্ব সম্ভবতঃ এখনও আছে, সেই বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ কথাটাই এর প্রারম্ভিক অনুপ্রেরণা। সেটা ছিল বাংলার ক্ষয়িষ্ণু শিল্পে (ইন্ডাস্ট্রী) পুনুরুজ্জীবনের তাগিদে নতুন এক ভাবনার জোয়ার আনার প্রয়াস এবং সেই প্রয়াসের ফসল হল ঐ রকম একটা সংগঠন। আমরা শিল্পীরা যদি ঐ রকম একটা কলাশিল্পের জোয়ারে ভাসতে চাই তাতে ক্ষতি কি? খুব সত্যি কথা বলতে কি ষাট বা সত্তর দশক পেরিয়ে ৮০ থেকে ২০১৪ অবধি বাংলার মূলস্রোত বা মেইনস্ট্রীম শিল্পকলায় কি নতুন কোনও চিত্রভাষার জন্ম হয়েছে যা একটা মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে। যা হচ্ছে তা তো ৬০ বা ৭০-এর প্যারাডাইম-এর অনুসরণ ও চর্চা যার মড়াটাকে এই সময়ের খাটিয়ায় চাপিয়ে আজও বয়ে চলেছেন একদল প্রতিষ্টিত মেইনস্ট্রীম শিল্পী। অবশ্য ২০০০ সালের পর বিশ্বায়ন জনিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে নবীন প্রজন্মের যে সব শিল্পী নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা নির্ভর আর্টের চর্চা করছেন এবং নিও কলোনাইজড হয়ে উঠছেন তাঁদের কথা আলাদা যদিও সেক্ষেত্রে ‘মিমিক্রি’-র ছড়াছড়ি– এ কথা মেইনস্ট্রীম কলা সমালোচকের ভাষ্য, আমার নয়।

পরিশেষে, আমরা যারা আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা পাল্টা ‘বাউন্স’ দিতে চাই তাঁদের অনেকেই পঞ্চাশ বা মধ্য পঞ্চাশ পেরোনো— প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে নিজেদের মানসিক শক্তিকে সংহত করে যে নবতর পরিক্রমা (জার্নি) শুরু করতে চলেছি তার ভবিষ্যৎ কি হবে তা আমরা জানি না। জানা সম্ভবও নয়, শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা ছাড়া! সেজন্য নিজেদের মধ্যে একটা মানসিক বন্ধন দৃঢ়তর হওয়া দরকার! হয়ে ওঠার দরকার একটা পরিবারের মতন এবং সেই সঙ্গে উচ্চারিত হোক “চরৈবতী চরৈবতী”– এই সুপ্রাচীন শ্লোক। সঙ্গে থাকুক “আত্মাসংস্কৃতির্বাব শিল্পাণি”-র মতন মহতী ভাষা।

পুনশ্চঃ বলে রাখা দরকার এবং আমিও ব্যক্তিগত ভাবে নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে এই দলের নাম পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, ভাবনা এমনকি দর্শনগত অভিমত পাল্টে যেতে পারে এবং এই কারণেই পালটে যেতে পারে যে — যা আমাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, ভাবনার বিভিন্ন স্তর, প্রভেদ, শিল্পভাষার মিল বা অমিল, প্রাথমিক কর্মকান্ডের ফলাফল বাস্তবিক তার প্রয়োগ, আন্দোলন, কূট তর্কবিতর্ক থেকে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ– এসব যা কিছুর উপস্থিতি এবং অনেক মানুষের অনেক শিল্পীর বহুমাত্রিক মেধার সংযোজনে আমরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে পারি আর তাতেই হয়তো দল অথবা সংগঠন শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতির মতন অন্য একটি পর্যায়ে রূপান্তরিত হবে। যাকে বলা যায় একটা ট্রান্সফরমেশান, আমি আশাকরি, এই দল কিছুদিন প্রস্তুতি নেবে প্ল্যাটফর্ম হিসাবে অনেকগুলো ভাবনার সমন্বয়ের কাজ করবে, তারপর অবলুপ্তি ঘটবে তখনকার পরিস্থিতি এবং সময়ের দাবীতে।

— নীলোৎপল সিংহ

[এই লেখাটা আগেই সংগঠন-সদস্যদের মধ্যে প্রিন্ট ও ডিজিটাল ফরম্যাট-এ বিতরণ করা হয়েছিল। বাংলাব্লগে সামান্য সংশোধন ও সম্পাদনা করে উপস্থিত করা হল। মতামত লেখকের নিজস্ব।  লেখক বাই-এর একজন সদস্য। ] –বাংলাব্লগ টিম
Advertisements

About নীলসীন neelseen

নীলোৎপল সিংহ ( জন্ম.১৯৬০ ) কলকাতায় (ক্যালকাটা, ভারত ) বসবাস করেন। একজন কলকাতাবাসী শিল্পী হিসাবে তিনি দীর্ঘ ত্রিশবছর ব্যাপী চিত্রকলা ও নিউ মিডিয়া প্রকল্প চর্চার সঙ্গে যুক্ত আছেন। Nilotpal Sinha ( b.1960 ) lives in Kolkata (Calcutta, India ), Being a Kolkata based artist he is engaged in painting and new media projects during last thirty years.
This entry was posted in প্রবন্ধ, বাংলাব্লগ, শিল্প and tagged , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.